কা'ব বিন মালিক (রাঃ)-এর তওবা ( হাদিসের গল্প )



Tag: তওবা,তওবা করার সঠিক নিয়ম ,তওবা লাভের অলৌকিক গল্প,তওবা করার নিয়ম,তওবা করার দোয়া,তওবা'র বিস্ময়কর ঘটনা,তওবার দোয়া,তওবার দোয়া,তাওবা,তাওবা কবুল,তাওবার ওয়াজ,তাওবা সংক্রান্ত একটি আশ্চর্য জনক ঘটনা,তাওবা সম্পর্কে আলোচনা,ইসলামিক কাহিনী ,ইসলামিক গল্প ও কাহিনী,ইসলামের কাহিনী,তাওবাতুন নাসুহা,বাংলা ইসলামিক গল্প


আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন কা'ব বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
কা'ব বিন মালিকের পুত্রদের মধ্যে আব্দুল্লাহ তাঁর পিতা কা'ব (রাঃ) অন্ধ
হয়ে যাওয়ার পর তার সাহায্যকারী ও পঞ্ প্রদর্শনকারী ছিলেন। আব্দুল্লাহ
বলেন, আমি কা'ব বিন মালিককে তার তাবুক যুদ্ধে পেছনে থেকে যাওয়ার
ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। কা'ব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তাবুক ও বদর ছাড়া আর কোন যুদ্ধেই
আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন,
তাদের কাউকে তিনি ভর্সনা করেননি। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শুধুমাত্র
একটি কুরাইশ কাফেলার সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ
তা'আলা তাঁদের ও শত্রুদের মাঝে অঘোষিত এ যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর
আকাবার রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন
ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে কামে থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ
গ্রহণ করেন। তাই আমি আকাবার বাইয়াতের চেয়ে বদরের যুদ্ধকে অধিক
শুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম না। যদিও মানুষের মাঝে আকাবার ঘটনা অপেক্ষা
বদর যুদ্ধ অধিক প্রসিদ্ধ ছিল।
ধাহােক আমার ঘটনা এই যে, আমি যখন তাবুকের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলাম,
সে সময়ের চেয়ে অন্য কোন সময়েই আমি অধিক শক্তিশালী ও সচ্ছল
ছিলাম না। আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার কাছে কখনাে একসাথে দুটো
সওয়ারী ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের সময় (যুদ্ধের পূর্বে) আমি তা সংগ্রহ
করেছিলাম। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখনই কোন যুদ্ধের ইচ্ছা করতেন,
তখন (যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে) সেজন্য বিপরীত পন্থা অবলম্বন
করতেন। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় যখন আসল, তখন ছিল ভীষণ গরম । পথ
ছিল দীর্ঘ এবং স্থান ছিল বিশাল মরুভূমি। আর শত্রুর সংখ্যাও ছিল অনেক
বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যেদিকে যাত্রা করবেন, তা বলে দিলেন।
যাতে তারা তাদের যুদ্ধের সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তখন তার সাথে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ছিলেন। তবে তাদের নাম কোন রেজিস্ট্রারে
লিপিবদ্ধ ছিল না।
কা'ব (রাঃ) বলেন, ফলে যদি কেউ যুদ্ধে না যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করত,
তাহলে সহজেই তা করতে পারত, যতক্ষণ না তার বিষয়ে অহি নাযিল
হয়। রাসূলুল্লাহ (ছঃ) এমন এক সময় এ অভিযান শুরু করেছিলেন, যখন
ফলমূল পাকার ও গাছের ছায়ায় শ্রিাম নেয়ার সময় ছিল। রাসূল (ছাঃ)
এবং তাঁর সাথে সকল মুসলমান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমিও প্রত্যহ
সকালে তাদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু ফিরে এসে
কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। শুধু মনে মনে বলতাম, আমি তাে যে কোন
সময় প্রস্তুত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। এভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আমার সময়
কেটে যেতে লাগল। পক্ষান্তরে লােকেরা পুরােদমে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল।
একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুসলমানদের নিয়ে রওয়ানা দিলেন।
অথচ তখনাে আমি কোন প্রকার প্রস্তুতি নেইনি। মনে মনে ভাবলাম,
দু'এক দিন পরে প্রতি নিয়েও তাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারব। তারা চলে
যাওয়ার পর এদা আমি মসজিদে গেলাম এবং প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা
করলাম কিন্তু সিদ্ধান্তহীনভাবে ফিরে আসলাম। পরদিন সকালে যাওয়ার
নিয়ত করলাম, কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত না নিয়েই ফিরে আসলাম। আমার এ
দোদুল্যমানতা মাঝে মুসলিম সেনারা দ্রুত চলছিলেন এবং বহুদূর চলে
গেলেন। আর আমি রওনা দিয়ে তাদের ধরে ফেলার ইচ্ছা পােষণ করতে
খালাম। আফসােস। আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম (তাহলে ভালই
হ'ত)। কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চলে যাওয়ার
পর আমি যখন বাইরে বের হ'তাম, তখন পথে-ঘাটে মুনাফিকদেরকে
অ দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন,
তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। আর এটা আমাকে চিন্ত
দ্বিত করে তুলত।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাবুকে পৌছার আগে পর্যন্ত আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন
, তবে তাবুকে পৌছে যখন তিনি সবাইকে নিয়ে বসলেন, তখন জিজেস
করলেন, 'কাবের কি হল? ব্নী সালামার একজন বাক্তি বললেন, হে
আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)। তাঁর বসন-ভূষণ ও অহংকারই তাকে বাধা দিয়েছে।
মু'আম বিন জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি নিতান্তই বাজে কথা বললে ।
আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমরা তার ব্যাপারে ভাল বৈ
আর কিছুই জানি না। এতদ্রবণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) চুপ করে থাকলেন। কা'ব বিন মালিক (রাঃ) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রত্যাবর্তন
সম্পর্কে অবহিত হলাম, তখন আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। ভাবতে
লাগলাম, কোন মিথ্যা তালবাহানা করা যায় কি-না? যার মাধ্যমে
আগামীকাল আমি তার ক্রোধ থেকে বাঁচতে পারি। এ ব্যাপারে পরিবারের
কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তির পরামর্শও চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন বলা হ’ল যে,
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনার একেবারে নিকট এসে পৌছে গেছেন, তখন
আমার মন থেকে বাতিল ধ্যান-ধারণা বিদূরিত হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত
হয়ে গেলাম যে, তাঁর নিকট মিথ্যা বলে আমি মুক্তি পাব না। সুতরাং সতা
বলার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী হলাম।
সকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় পৌছে গেলেন। আর তার নিয়ম ছিল
যখনই তিনি সফর থেকে ফিরে আসতেন, প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং
সেখানে দু'রাক'আত ছালাত আদায় তেন। তারপর লােকদের সাথে
সাক্ষাৎ করার জুন) বসে যেতেন। যখন তিনি ছালাত শেষ করে (মসজিদে
বতে) বসে গেলেন, তখন তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা লােকেরা
আসতে লাগল। তারা হলফ করে নিজেদের ওজর পেশ করতে লাগল।
এদের সংখ্যা ছিল আশি উর্ধ্বে। বাহ্যিক অবস্থার বিচারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
তাদের ঔষর কবুল করতঃ তাদের কাছ থেকে পুনরায় বায়আত নিয়ে
তাদের মাগফিরাতের জন্য দো'আ করালেন এবং তাদের মনের গােপন
বিষয় আল্লাহর নিকট সােপর্দ করলেন।
কা'ব (রাঃ) বলেন, আমিও আসলাম তার কাছে। আমি সালাম দিতেই
তিনি বিগমিশ্রিত মুচকি হেসে বললেন, 'এস এস। আমি গিয়ে তাঁর
সামনে বসে পড়লাম। অতঃপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি
কারণে তুমি পিছনে পড়ে থাকলে? তুমি কি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাহন ক্রয়
করনি? আমি বললাম যে, ক্রয় করেছি। আরাে বললাম, আল্লাহর কসম।
যদি আমি আপনার সামনে না বসে দুনিয়ার অন্য কোন লােকের সামনে
বসতাম, তাহলে আমি নিশ্চিত যে, যে কোন এর পেশ করে তার
ক্রোধকে নির্বাপিত করতে পারতাম। আর আমি তর্কে পটু। কি আল্লাহর
শপথ! আমি জানি, আজ যদি আপনার কাছে মিথ্যা বলে আপনাকে খুশী
করে যায়, তাহলে অচিরেই আল্লাহ আপনাকে আমার উপর ক্রুদ্ধ করে
দিবেন। আর যদি আজ আপনার সাথে সত্য কথা বলে যাই, তাতে আপনি
নাখােশ হ'লেও আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। আল্লাহর কসম আমার কোন ওর ছিল না। আল্লাহর কসম! আমি যখন (অথ তাবুক
যুদ্ধে) আপনাদের থেকে পিছনে থেকে যাই, তখনকার মত আর কোন সময়
আমি ততটা শক্তি-সামর্থ্যের ও সচ্ছলতার অধিকারী ছিলাম না। একথা
শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, 'যদি আসলে একূপ হয়, তবে তা সত্য।
বলেছে । ঠিক আছে, চলে যাও, দেখ আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি ফায়ছালা
দেন।
আমি উঠে পড়লাম। বনী সালামার কিছু লােক আমাকে অনুসরণ করতে
লাগল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহ্র কসমঃ ইতিপূর্বে তুমি কোন পাপ
করেছ বলে তাে আমরা জানি না। পেছনে থেকে যাওয়া অন্যান্য লােকদের
মত তুমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট একটা বাহানা পেশ করতে পারলে
না? তাহলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনাই তােমার পাপ মােচনের
জনা যথেষ্ট হয়ে যেত। তারা আমাকে এমনভাবে তিরস্কার করতে লাগল
‌যে, একপর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে ফিরে গিয়ে আমার প্রথম
কথাটিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মনস্থ করলাম। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞেস
করলাম, আচ্ছা আমার মতাে নিজের ভুল স্বীকার করেছে এমন আর
কাউকেও কি তােমরা সেখানে দেখেছ? তার জবাব দিল, হ্যা, আরাে
দুজন লােককে
আমরা দেখেছি, যারা তোমার মত একই কথা বলেছে।
আর তাদেরকেও তােমার মতো সেই একই কথা বলা হয়েছে। আমি
জিজ্ঞেস করলাম, তারা কারা? লােকেরা জবাব দিল, তারা দুজন হচ্ছেন
মুরারাহ বিন রাবী আল-আমরী এবং হিলাল বিন উমাইয়া আল-ওয়াকেফী।
তারা আমার কাছে এমন দুজন সৎ লােকের কথা বললেন, যাঁরা বদর যুদ্ধে
অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আদর্শস্থানীয় ছিলেন। তাদের দুজনের কথা
শুনে আমি চলতে শুরু করলাম।
এদিকে রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের মধ্য থেকে
আমাদের এ তিনজনের সাথে কথা বলা সমস্ত মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ
ঘােষণা করে দিয়েছে। কাজেই লোকেরা আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে
লাগল এবং আমাদের প্রতি তাদের আচরণ পরিবর্তন করে ফেলল।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে লাগল যে, চিরচেনা দুনিয়া যেন অচেনা হয়ে গেছে।
এ অবস্থায় আমরা ৫০ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার সাথীদ্য় নীৰ
হয়ে ঘরের মধ্যে বসে গেলেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তবে আমি
ছিলাম খুব শক্তিশালী ও ধৈর্যশীল মুবক। তাই আমি বাইরে বের হয়ে মুসলমানদের সাথে ছালাতে যোগ দিতাম এবং বাইরে ঘোরাফেরা করতাম।
কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না। আমি রাসুলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে
আসতাম। তিনি যখন ছালাতের পর মজলিসে বসতেন, আমি তাকে সালাম
দিতাম। আমি মনে মনে বলতাম, আমার সালামের জবাবে তার ঠোট
নড়ল, কি নড়ল না? তারপর আমি তার সন্নিকটে ছালাত আদায় করতাম।
আমি আড়চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখতাম। কাজেই দেখতে পেতাম
যে, যখন আমি ছালাতে মশগুল থাকি, তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে
থাকেন। আর আমি যখন তার দিকে দৃষ্টি দিতাম, তখন তিনি মুখ
ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লােকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা
দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকল।
একদিন আমার চাচাতো ভাই আবু কাতাদাহ বাগানের প্রাচীর টপকে তার
কাছে আসলাম। সে ছিল আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমি তাকে সালাম
দিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি
তাকে বললাম, হে আবু কাতাদাহ! আল্লাহর দোহায় দিয়ে তোমাকে
জিজ্ঞেস করি, তুমি কি জান না, আমি আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাঃ)-কে
ভালবাসি? সে চুপ করে থাকল। আমি আবার আল্লাহ্র নামে কাম করে
তাকে এ প্রশ্ন করলাম। এবারও সে চুপ করে থাকল। আমি তৃতীয়বার
তাকে একই প্রশ্ন করলাম। এবার সে জবাব দিল, '(এ ব্যাপারে) আল্লাহ ও
তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। (এতদশ্রবণে) আমার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু
গড়িয়ে পড়তে লাগল। অতঃপর প্রাচীর টপকে পুনরায় নিয়ে এলাম।
কাব বলেন, ইত্যবসরে একদিন আমি মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম।
সিরিয়ার একজন খৃষ্টান কৃষক মদীনার বাজরে খাদ্যশস্য বিক্রি করতে
এসেছিল। সে লােকদেরকে জিজেস করছিল, কে আমাকে কাৰ বিন
মালিকের ঠিকানা বলে দিতে পারে। তখন লোকেরা তাকে ইশারা করে
দেখিয়ে দিল। সে আমার কাছে এসে গাসসানের রাজার একটি চিঠি আমার
হাতে অর্পণ করল। তাতে লেখা ছিল, 'পর সমাচার এই যে, আমি জানতে
পেরেছি আপনার সাথী আপনার উপ যুম করেছেন। অথচ আল্লাহ
আপনাকে লাঞ্ছিত ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেননি। আমি আমাদের
এখানে চলে আসুন। আমরা আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব। চিঠিটা
পড়ে আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। কাজেই আমি চুলা খুঁজে
চিঠিটা আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম ।এভাবে ৫০ দিনের মধ্যে ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এমন সময়
আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন দূত এসে বললেন, রাসূল (ছাঃ)
তােমাকে তোমার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বললাম,
আমি কি তাকে তালাক দিব, না কি করব? তিনি বললেন, না, তালাক দিবে
না। বরং তার থেকে পৃথক থাকবে
এবং তার কাছে ঘেষবে না। আমার
অন্য দুজন সাথীর কাছেও এ মর্মে দূত পাঠানাে হল। আমি আমার স্ত্রীকে
বললাম, তুমি তােমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আর আল্লাহ আমার এ
ব্যাপারে কোন ফায়ছালা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান কর।
কাব (রাঃ) বলেন, হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এসে
বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! হিলাল বিন উমাইয়া অতিশয় বৃদ্ধ।
তার কোন সেবক নেই। যদি আমি তার সেবা করি, তবে কি আপনি
অলস করলে তিনি বাৰ লিনা, তবে সে যেন তােমার কাছে না
ঘেঁষে। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তার মধ্যে এ কাজের প্রতি
উৎসাহবােধ-ই নেই। আল্লাহর কসম! যেদিন থেকে এ ঘটনা ঘটেছে সেদিন
থেকে অদ্যাবধি সে কাঁদছে।
কাব (রাঃ) বলেন, আমাকেও আমার পরিবারের কেউ কেউ বলল, তুমিও
তােমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এস,
যাতে সে তােমার
সেবা করতে পারে, যেমন হিলাল ইবনে উমাইয়া স্ত্রী তার
স্বামীর সেবা করার ব্যাপারে অনুমতি নিয়ে এসেছে। আমি বললাম,
আল্লাহর কসম! আমি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে কোন অনুমতি আনতে যাব
। জানি না যখন আমি এ ব্যাপারে অনুমতি চাইব, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
কি বলবেন। কারণ আমি একজন যুবক। এভাবে আরাে দশ দিন
অতিবাহিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের সাথে কথাবার্তা বন্ধ
করে দেওয়ার পর পঞ্চাশতম রাত্রিটিও অতিক্রম করল। দিন সকালে
ফরের ছালাত আদায় করলাম এবং আমাদের এক মরের সানে
বসেছিলাম, যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। মনে হচ্ছিল,
জীবন ধারণ আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং পৃথিবী যেন তার সমস্ত
বিস্তীর্ণ সত্ত্বেও আমার জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন সময়
আমি সাল () পর্বতের উপর উচ্চৈস্বরে চীৎকারকারী একজনের শব্দ
শুনতে পেলাম। সে চাৎকার করে বলছে, হে কাব বিন মালিক! সুসংবাদ
গ্রহণ কর কা'ব বলেন, আমি আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে গেলাম। আমি
অনুধাবন করতে পারলাম যে, এবার সংকট কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ (স্থাঃ)
ফজরের ছালাতের পর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের
তওবা কবুল করেছেন। কাজেই লােকেরা আমার ও আমার অপর দুজন
সাথীর কাছে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আসতে লাগল। একজন তাে ঘােড়ায়
চড়ে এক দৌড়ে আমার কাছে আসলেন এবং আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি
দৌড়িয়ে পাহাড়ে উঠলেন। তার কথা অশ্বারোহীর চেয়েও দ্রুততর হাল।
যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে
আসল, তখন সুসংবাদ দেয়ার প্রতিদান স্বরূপ আমার পােশাক জোড়া খুলে
তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম! তখন আমার কাছে ঐ পােশাক
জোড়া ছাড়া আর কোন কাপড় ছিল না । তারপর আমি এক জোড়া
পােষাক ধার করে নিলাম এবং তা পরিধান করে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে
সাক্ষাতের নিমিত্তে বের হলাম। পথে দলে দলে লোকজন আমার সাথে
সাক্ষাৎ করছিল এবং তওবা কবুল হওয়ার জন্য তারা আমাকে মোবারকবাদ
জানাচ্ছেন। তারা বলছিল, তোমার তওবা কবুল করে আল্লাহ তােমাকে যে
পুরস্কৃত করেছেন, এজন্য তোমাকে মুবারকবাদ। কা'ব (রাঃ) বলেন,
এভাবে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) লােকজন
পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন। ত্বালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে দেখে
দৌড়ে এসে মুসাফাহা করলেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর
কমস! মুহাজিরদের মধ্য থেকে সে ব্যতীত অন্য কেউ এভাবে এসে
আমাকে ধন্যবাদ জানায়নি। আমি কোনদিন তার অনুগ্রহ ভুলব না।
কাৰ (রাঃ) বলেন, তারপর আমি রাসূলুক্াহ (ছাঃ)-কে সালাম দিলাম।
তখন খুশীতে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। রাসূল (ছাঃ) বললেন,
(হে কাব)! তােমার মা তােমাকে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত অতিক্রান্ত
দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর! কা'ব বলেন,
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)। এ (ক্ষমা) আপনার পক্ষ থেকে,
না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, না, এ তো আল্লাহর পক্ষ থেকে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন খুশী হতেন, তখন তার চেহারা এক ফালি চাঁদের
মত উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমরা চেহারা দেখে তাঁর খুশী বুঝতে পারলাম।
তারপর আমি তাঁর সামনে বসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমার
তওবা কবুলের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের পথে হদিকা করে দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,
তোমার সম্পদের কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দাও। তাতে তোমার
কল্যাণ হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি শুধু খাবারের অংশটুকুই
আমার জন্য রাখলাম। তারপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ
এবার সত্য কথা বলার কারণে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। কাজেই আমার এ
তওবা কবুল হওয়ার কারণে আমি জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলােতে সত্য।
কথাই বলতে থাক। আল্লাহর কসম! আমি জানি না, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর
কাছে সত্য কথা বলার কারণে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ আমার
প্রতি যে মেহেরবানী করেছেন, তেমনটি আর কোন মুসলমানের উপর
করেছেন কি-না। আর রাসূল (ছাঃ)-কে যেদিন থেকে এ কথা বলেছি,
সেদিন থেকে সজ্জানে মিথ্যা কথা বলিনি। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোর
আল্লাহ আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচাবেন কলে আশা করি। আর আল্লাহ
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল করেছেন, "আল্লাহ
অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের
প্রতি যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটকালে- এমনকি যখন তাদের এ
দলের চিত্ত-বৈকলোৰ উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে
দিলেন। তিনি তাে তাদের প্রতি দয়্, পরম দয়ালু। এবং তিনি ক্ষমা
রফোন অপর তিনজনকেও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল,
যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য তা সংকুচিত হয়েছিল
এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল এবং তারা উপলব্ধি
করেছিল , আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন
ব্যতীত, পরে তিনি তাদের তওবা কবুল করলেন যাতে তারা তওবা স্থির
থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ! তােমরা
আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও” ('তওবা ১১৭-১১৯)।
আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহণ করার পর এর চাইতে উৎকৃষ্ট আর কোন
অনুগ্রহ আল্লাহ আমার উপর করেননি যে, রাসূল (ছাঃ)-এর সামনে সত্য
বলার তাওকীক দান করে আমাকে ধ্ংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে।
অন্যথা অন্যান্য মিথ্যাবাদীদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। কারণ অহি
যখন নাযিল হচ্ছিল (অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায়), সে সময় যারা
মিথ্যা বলেছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ যে মারাত্বক কথা বলেছিলেন, তা
আর কারাে সম্পর্কে বলেননি। মহান আল্লাহ বলেছিলেন, তােমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে অচিরেই তারা আল্লাহর শপথ করবে যাতে তোমরা
তাদের উপেক্ষা কর। সুতরাং তােমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে। তারা
অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাসস্থল।
তারা তোমাদের নিকট শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সম্ভুষ্ট হও।
তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ তাে সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি
তুষ্ট হবেন না (তব ৯৫-৯৬)।
কা'ব (রাঃ) বলেন, আর আমরা তিনজন সেসব লোকদের থেকে আলাদা,
যারা তাদের যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে মিথ্যা
শপথ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের কথা মেনে নিয়ে তাদেরকে
বায় আত করিয়েছিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন । কিন্তু
আমাদের ব্যাপারটি তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন (আল্লাহর উপর)। শেষ পর্যন্ত
আল্লাহ যে ব্যাপারে ফায়ছালা দিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন,
সেই তিনজন, যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল' (ওক ১১৮)। (অখা আল্লাহ
তাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন)। যারা জেনে বুঝে জিহাদ থেকে পেছনে
থেকে গিয়েছিল, তাদের কথা এখানে বলা হয়নি। বরং এখানে কেবল
আমাদের তিনজনে) কথা বলা হয়েছিল। আর যারা হলফ করেছিল ও
ওযর পেশ করেছিল এবং তাদের ওষুধ রাসূল (ছাঃ) গ্রহণ করেছিলেন
তাদের থেকে আমাদের ব্যাপারে ফায়ছালাটি পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।
५ীহ বুখারী, হ/৪৪১৮ মাগা্ী অধ্যায়, কব বিন মালিকের ঘটন অনু্ে,
মুসলিম হ/২৭৬৯, তওবা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯
শিক্ষা।
১. সত্য কথা বিপদ থেকে মুক্তি দেয়।
২. কোন আনন্দের সংবাদে দিশেহারা না হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়
করা উচিৎ।
৩, মুমিন ব্যক্তি তার কর্তব্য পালনে অবহেলা করলে ব্যথিত-মর্মাহত হয়।
৪, মুমিন তার ভাইকে কখনাে লাঞ্ছিত-অপদস্থ-অপমানিত করবে না; বরং
তার মান-সম্মান রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।
৫, মুমিন ব্যক্তি কোন প্রলােতনে পড়ে তার দ্বীন-ধর্মকে বিকিয়ে দিতে পারে না।
৬. যদি মানুষ শয়তানী প্ররােচনায় পাপ করে ফেলে তাহলে সে তওবার
মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হতে পারে।

Post a comment

0 Comments